বিভিন্ন বড় অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি সমন্বয়ের পর প্রকৃত ঋণের ব্যয় বা সুদহার এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চে পৌঁছেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন সরকারের পক্ষ থেকে রেকর্ড পরিমাণ বন্ড বিক্রির কারণে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ফলে বিশ্ব পুঁজিবাজার ও সার্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। খবর রয়টার্স।
প্রকৃত সুদহার বলতে মূল্যস্ফীতির হারের অতিরিক্ত সেই লভ্যাংশকে বোঝায়, যা বন্ড বিনিয়োগকারীরা দাবি করে থাকেন। সরকার ও বিভিন্ন কোম্পানির জন্য প্রকৃত ঋণ নেয়ার খরচের এটি একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক। সাধারণত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশা, সুদহার এবং মুদ্রার চাহিদা ও জোগানের ওপর ভিত্তি করে এ হার নির্ধারিত হয়।
সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী, মূল্যস্ফীতি সংযুক্ত বন্ডের হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রের ৩০ বছর মেয়াদি প্রকৃত সুদহার প্রায় ৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা ১৮ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। অন্যদিকে যুক্তরাজ্য ও জার্মানির ১০ বছর মেয়াদি প্রকৃত সুদহারও এক দশকের বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে লেনদেন হচ্ছে।
বিশ্লেষক ও বিনিয়োগকারীদের মতে, এআই খাতের বড় প্রতিষ্ঠান বা হাইপারস্কেলারদের মাত্রাতিরিক্ত ঋণ গ্রহণ এ পরিস্থিতি তৈরিতে প্রধান ভূমিকা রাখছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সরকারের চড়া খরচ। বাজারে একের পর এক বন্ড বাজারে আসায় ক্রেতারা তা কিনে রাখতে আরো বেশি রিটার্ন বা লভ্যাংশ দাবি করছেন। ফলে বৈশ্বিক পুঁজিবাজারে অর্থের জন্য এক অভূতপূর্ব প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে, যা বন্ডের সুদহার আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে। গত বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্র ৩০ বছর মেয়াদি বন্ডের নিলামে ২০০১ সালের পর থেকে সর্বোচ্চ ৫ দশমিক ২২ শতাংশ সুদ পরিশোধ করেছে।
বন্ডের এ অতিরিক্ত সরবরাহের প্রধান কারণ প্রযুক্তি খাতের জায়ান্টরা। বাজার বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান রিফিনিটিভ ও এলএসইজির তথ্যানুযায়ী, অ্যালফাবেট, অ্যামাজন ও মেটার মতো শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো এ বছর এখন পর্যন্ত প্রায় ২২ হাজার কোটি ডলারের বন্ড ছেড়েছে। অথচ ২০২৫ সালে অংকটি ছিল মাত্র ১০ হাজার ৮০০ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে তা দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে গেছে। ব্ল্যাকরক ইনভেস্টমেন্ট ইনস্টিটিউটের ইউকে প্রধান বিনিয়োগ কৌশলবিদ বিবেক পল বলেন, ‘বর্তমানে পুঁজির জন্য যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে, সাম্প্রতিক অতীতে তার কোনো নজির নেই। এআই খাতের অবকাঠামো তৈরির কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাওয়ায় পুঁজির এ সংকট ও প্রতিযোগিতাপূর্ণ পরিবেশ আরো ত্বরান্বিত হচ্ছে।’
একই সঙ্গে বিভিন্ন দেশের সরকারও বাজেট ঘাটতি মেটাতে প্রচুর ঋণ নিচ্ছে। চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রের বাজেট ঘাটতি জিডিপির প্রায় ৬ শতাংশ বা ১ দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন ডলারে গিয়ে ঠেকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এছাড়া ফ্রান্সে এ ঘাটতি ৫ ও যুক্তরাজ্যে ৪ শতাংশ। ইউরোপের বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, সেখানে এআইয়ের চেয়ে প্রতিরক্ষা খাত, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং অবকাঠামোগত বিনিয়োগের পেছনেই সরকারি ব্যয় বেশি হচ্ছে।
বাজার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো নতুন করে সুদহার বাড়াতে পারে, এমন সম্ভাবনার কথাও মাথায় রাখছেন বিনিয়োগকারীরা। তাছাড়া বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি বেশ শক্ত অবস্থান এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর বন্ড কেনা বন্ধ রাখা প্রকৃত সুদহার বাড়াতে ভূমিকা রাখছে। অতীতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর বন্ড ক্রয়ের কারণে সুদহার কিছুটা নিয়ন্ত্রণে ছিল।
পুঁজিবাজারের ওপর এর বড় ধরনের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তত্ত্বগতভাবে প্রকৃত সুদহার বাড়লে শেয়ারবাজারের আকর্ষণ কমে যায়। কারণ বিনিয়োগকারীরা তখন বন্ডে বিনিয়োগ করেই ভালো ও নিরাপদ মুনাফা পেতে পারেন। তা সত্ত্বেও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শেয়ারবাজার এখন পর্যন্ত শক্তিশালী করপোরেট মুনাফা এবং স্থিতিশীল অর্থনীতির ওপর ভর করে রেকর্ড উচ্চতায় অবস্থান করছে। জেপি মরগান যুক্তরাষ্ট্রের এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচকের মুনাফার পূর্বাভাস বাড়িয়েছে। ইউরোপের বড় কোম্পানিগুলোর মুনাফাও দ্রুতগতিতে বাড়ছে।
তবে সতর্কবার্তা দিয়েছেন অনেক বিশ্লেষক। সাতোরি ইনসাইটসের প্রতিষ্ঠাতা ম্যাট কিং মনে করেন, বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের হাতে থাকা নগদ অর্থ দ্রুত খরচ করে ফেলছে এবং সামনের দিনগুলোয় তাদের ঋণের ওপর আরো বেশি নির্ভর করতে হবে। যখন প্রকৃত সুদহার আরো বাড়বে, তখন তা কোম্পানিগুলোর ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তার মতে, ঋণ গ্রহণ ও শেয়ারবাজারের এ গতি থমকে না যাওয়া পর্যন্ত প্রকৃত সুদহার বাড়তে থাকবে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ঋণ নেয়ার ব্যয় মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে গেলে একপর্যায়ে কোম্পানি ও সাধারণ মানুষ খরচ ও বিনিয়োগ কমিয়ে দিতে বাধ্য হবে, ফলে শ্লথ হয়ে পড়তে পারে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। নিউবার্গারের চিফ ইনভেস্টিগমেন্ট অফিসার অশোক ভাটিয়া জানান, যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত সুদহার এখনো এমন এক স্তরের নিচে রয়েছে, যেখানে তা সরাসরি অর্থনীতিতে বড় আঘাত হানতে পারে না। তবে বর্তমান পরিস্থিতি ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা।